শিক্ষকতা করতে গিয়ে একটি মজার ঘটনা এবং দেশের শিক্ষাব্যাবস্থা নিয়ে আমার উপলব্ধি

একদিন মাইনর ডিপার্টমেন্টে ক্লাস নিতে গিয়েছিলাম। ক্লাসের বিষয় ছিল সার্কিট অ্যানালাইসিস। তো মোটামুটি অনেক দূরই পড়িয়ে ফেলেছি। এখন একজন ছাত্রকে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করলাম, “ক্লাস বুঝতেছ?” ছাত্রটি যথারীতিই একটু পোঙটা ছিল এবং আমার প্রশ্নের জবাবে বলল “না স্যার কিছুই বুঝতে পারছিনা”। আমি তাকে আবার বললাম “কেন, কোথায় বুঝতে পারছনা আমাকে বল?”। সে বলল, “স্যার কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব? আমি তো আসলে কোন কিছুই বুঝিনা এই ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর”। মনে মনে বেশ বিরক্ত হলাম চিন্তা করলাম ক্লাস থেকে বের করে দিব। পরে চিন্তা করলাম, এইটা আসলে নিষ্ঠুরতা। তাই ছেলেটাকে বললাম তুমি কেন বোঝনা আমাকে নির্ভয়ে বলতে পার। সে অনেক ভয়ে ভয়ে মাথা নিচু করে বলল, “স্যার আমি আসলে ইলেকট্রন দেখতে পাইনা তো, তাই বুঝিনা যে সে হঠাৎ হঠাৎ কোনদিকে দৌড় দেয়”। সাথে সাথে ক্লাসের সবাই অনেক জোরে হাসতে লাগল। মন চাইল এইবার একটা চপেটাঘাত করেই দেই। ধৈর্‍্যের আরও পরীক্ষা দেওয়ার জন্য এইবারও বোঝার চেষ্টা করলাম সে আসলে কি বলতে চায়। পরে আবিস্কার করতে পারলাম সে আসলে এইটাই বলতে চায় যে সে ইলেকট্রন দেখতে পায়না এবং অ্যানালাইসিস করার সময়ে কোথায় থেকে কোনদিকে দৌড় দেয় কিছুই তার মাথায় আসেনা।

আমি তাকে তার মতো করে প্রশ্ন করলাম, “আচ্ছা কখন থেকে তুমি বোঝনা যে, ইলেকট্রন কোনদিকে দৌড় দেয়”। সে বলল স্যার প্রথম থেকেই। তারমানে, সে ক্লাসের প্রথম টপিক ওহমের ‘ল’ থেকেই আসলে বোঝেনা। আমিও এখন নাছোড়বান্দা হয়ে লেগেছি, চিন্তা করছি বুঝবিনা মানে তোকে আমি আজকে দেখায়েই ছাড়ব ইলেকট্রন। সেদিনের ক্লাসের সব টপিক পড়ানো বাদ দিয়ে আমি এই ছাত্রকে বুঝাইতে লেগে গেলাম। মেথড ১ অ্যাপ্লাই করে ব্যর্থ হলাম। মেথডটা ছিল আবার নতুন করে আগের জিনিস বুঝানো। লাভ হল না।

মেথড ২ শুরু করলাম, মাথায় এখন একটা জিনিসই কাজ করছিল, সে ইলেকট্রন দেখেনা, কিন্তু আমার তাকে ইলেকট্রন দেখাতেই হবে।

সবাইকে একটি গল্প বলা শুরু করলাম, মনে কর তোমাদের ক্লাসে চারজন বন্ধু আছে- পারভেজ, জিতু, সাদ এবং ফাহাদ। বিজ্ঞানী জিতু একদিন বাকি তিন জনকে একটা প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিল। প্রতিযোগিতাটা ছিল এমন- যে ফাহাদ পারভেজকে ধাক্কা দিয়ে একটা দরজার মাঝে দিয়ে একটা রুমে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করবে, আর সাদ দরজা আটকায়ে ধরে রাখবে যেন পারভেজ রুমে না ঢুকতে পারে। এতে বোঝা যাবে কে কত শক্তিমান। আগেই বলে রাখি পারভেজ কিন্তু অনেক বড়সড় সাইজের এবং সাদ অনেক প্রতি্যোগিতা মনোভাবাপন্ন। তো সাদ কিছুতেই হার মানার নয় এবং পারভেজকে রুমের মাঝে ঢোকাতেই হবে ফাহাদের তাছাড়া তারা প্রতিযোগিতায় হেরে যাবে। যথারীতি প্রতিযোগিতা শুরু হল এবং ফাহাদ জোর করে পারভেজকে রুমে ঢুকিয়ে দিল এবং তারা জিতে গেল।

এই কাহিনী শেষ করার সাথে সাথেই ছাত্রছাত্রীরা অনেকে হেসে দিল কারণ তারা এদের সবাইকেই চেনে এবং সবার চেহারায় একই প্রশ্ন, “স্যার কেন এইসব আমাদের শুনাচ্ছেন”। এরপরে আমি খেয়াল করলাম আমার সেই ছাত্র হেসে দিয়ে বলল “স্যার বুঝে গেছি”। আমি বললাম “কি বুঝেছ?” সে আমাকে বলল স্যার এখন আমি ইলেকট্রন দেখে ফেলেছি। এখানে ইলেকট্রন হল পারভেজ, ফাহাদ ব্যাটারি এবং সাদ হল রেজিস্‌টেন্স। সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে, আমি অনেক স্বস্তি পেলাম। এখন আমি সবাইকে প্রশ্ন করলাম, বলতো এখানে ওহম কে? তারা সবাই একসাথে উত্তর দিল, “জিতু”।

আমি তাদেরকে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলাম, বললাম ব্যাটারির ভোল্টেজ ইলেকট্রনকে সব সময় ধাক্কা দেয় ফাহাদের মত, আর রেজিস্‌টেন্স সবসময় বাধা দেয় সাদের মত যেন ইলেকট্রন(পারভেজ) চলাচল করতে না পারে। ভোল্টেজ যত বেশি হবে তত তাড়াতাড়ি ইলেকট্রনগুলো চলাচল করবে এবং কারেন্ট তত বেশি হবে। তারমানে, ভোল্টেজের সাথে সমানুপাতিক ভাবে কারেন্টের মানের পরিবর্তন হবে। কি ভাবে কারেন্ট পরিবর্তন হবে তা নির্ভর করবে সাদের শক্তির উপর, যাকে আমরা রেজিস্‌টেন্সের মান বলে থাকি। অতপর ফাহাদের যতক্ষন পর্যন্ত শক্তি আছে সে এই ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা চালাতে থাকবে। ফাহাদের এই শক্তিই হচ্ছে ব্যাটারির শক্তি যাকে আমরা এনার্জি বলে থাকি, যা ব্যাটারির গায়ে অ্যাম্পিয়ার আওয়ার ইউনিটে লেখা থাকে। আমার ক্লাসের সবাই এখন আমার গল্পের অর্থ বুঝতে পারল। সেই ছেলেটি আমার ক্লাস সেদিন থেকেই বোঝা শুরু করেছিল।

এই ঘটনা থেকে আমি কিছু ব্যাপার উপলব্ধি করেছি। সেগুলো হলঃ

১ : আমাদের দেশে বিজ্ঞান নিয়ে চর্চার অনেক ঘাটতি আছে। ছাত্রছাত্রীদের আমরা শিক্ষকরা, বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করাতে পারছিনা। শুধু শিখিয়ে দিচ্ছি কিভাবে বেশি বেশি পড়ালেখা করে বেশি বেশি নম্বর পেতে হয়। বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীরাই মন থেকে অনুভব করেনা তারা কি শিখছে। পড়ালেখার মাঝেও যে কি পরিমান মজা আছে তারা তখনি উপলব্ধি করতে পারবে যখন তারা নিজে নিজে কিছু তৈরী করতে পারবে।

আমি ছোটবেলায় অনেক আশা করেছিলাম প্রথম কাগজের প্লেন্‌টা হয়ত আমার শিক্ষকের কাছে থেকেই বানানো শিখব! কিন্তু আসলে কি তাই হয় বাস্তবে? আমাদের বাবা-মা, আমাদের শিক্ষক যখন দেখেন পড়ালেখা ছেড়ে অন্যকিছু করছে তখন তারা রীতিমত বিরক্ত হন। এতে করে আমাদের ছেলেমেয়েদের কিছু তৈরী করার ইচ্ছা অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যায়।

আমি জানি আমাদের দেশে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, আমরা অনেক গরীব দেশ কিন্তু মেধার দিক থেকে তো আমরা গরীব না। আমরা চাইলেই এই অসাধারণ মেধাকে কাজে লাগিয়ে অনেক কিছু তৈরী করে ফেলতে পারি।

২ : পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ না থাকার প্রধান কারণ হিসেবে আমি চিহ্নিত করব আমাদের মনোযোগ সৃষ্টি না করতে পারাকে। আমরা যদি কিছু তৈরী করার আনন্দ সঠিকভাবে স্থাপন করতে পারি ছাত্রছাত্রীদের মনে, তাহলে আমার মনে হয়না আমাদের এত ছাত্রছাত্রী অকালেই ঝরে পড়বে। নেশা কিংবা নোংরা রাজনীতির চেয়ে, পড়ালেখাটাকেই বেছে নেবে। আমাদের শিক্ষাঙ্গনের মত পবিত্র জায়গায় হানাহানি হবেনা।

৩ : শিক্ষকদের শেখানোর উপায়গুলো এতটাই একগুয়ে এবং ঘুম আসা হয়ে গিয়েছে যে, এখন আমাদের প্রায় সকল ছেলেমেয়েকেই কোচিং সেন্টারে যেতে হয় একাডেমিক কোচিং করতে। দেশে অনেক জ্ঞানী ব্যাক্তিদের মতে এইসব কোচিং সেন্টার বন্ধ করা উচিৎ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি, তারা কখনও শিক্ষকদের শিক্ষাদানের পদ্ধতি পরিবর্তনের কথা আলোচনা করেন না। কখনও চিন্তা করেন না, “যে ছেলেটা ক্লাস কেন করেনা”। শুধু চিন্তা করেন কিভাবে পাশ করার শতকরা হার আগের বছরের চেয়ে বেশি করানো যাবে, যা হবে গতবারের তুলনায় অথবা এদেশের সর্বকালের রেকর্ড।

৪ : আরেকটি ব্যাপার লক্ষ করবার মত, সেটা হল, ইদানিং অনেকে পড়ালেখাকে একটা ফ্যাশন হিসেবে মনে করে। ফ্যাশন করে অনেকেই বলে আমি অমুক ইউনিভার্সিটিতে বি.বি.এ অথবা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি। মেয়েকে অবশ্যই ডাক্তার বানাতে হবে, যদিও ডাক্তারি পড়া তার কোনকালেরই ইচ্ছা ছিল না। এই ফ্যাশন করার পেছনে আমি দায়ী করব আমাদের কিছু স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটিকে। আমি সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কথা বলছিনা, আমি বলছি আমাদের দেশের সব প্রতিষ্ঠান, কম বেশি সার্টিফিকেট বিক্রি করছে। একটু বড় করে চিন্তা করে বলতে চাই, আমরা যদি কাউকে যতটুকু, যে বিষয়ে, শেখানোর কথা তার চেয়ে কম শিখিয়ে সার্টিফিকেট দেয় তাহলেই সেটাকে বিক্রি বলা যেতে পারে।

সবশেষে বলতে চাই আমাদের দেশ এখন আগের মত নেই। এখন আমাদের স্বাক্ষরতা নিয়ে বেশি চিন্তা করতে হয়না। তাই আমাদের খুব তাড়াতাড়ি দেশের শিক্ষার মানকে যথাযত উন্নত করার পেছনে পদক্ষেপ নিতে হবে। শিক্ষাকে অনুৎপাদনশীল খাত হিসেবে চিহ্নিত না করে, এই খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। সবার এগিয়ে আসা উচিৎ এই শিক্ষাব্যাবস্থাকে দুষন মুক্ত রাখার জন্য। এইটা না করতে পারলে, কিছুদিন পরেই হয়ত আমরা বুঝবনা কাকে কোন জায়গার দায়িত্ব দেওয়া উচিৎ, কে কোন বিষয়ে আসলেই দক্ষ। দেখা যাবে যোগ্যতর ব্যাক্তিরা দেশবিমুখী হয়ে বিদেশের সেবা করবেন এবং অযোগ্য ব্যাক্তিরা দেশকে নিয়ে কানামাছি খেলবেন।

Advertisements

12 thoughts on “শিক্ষকতা করতে গিয়ে একটি মজার ঘটনা এবং দেশের শিক্ষাব্যাবস্থা নিয়ে আমার উপলব্ধি

  1. স্যারকে ধন্যবাদ, সরাসারি কোন বিষয়ে শিক্ষা না দিয়ে বিষয়টাকে বাস্তব কোন বিষয়ের সাথে মিলিয়ে উপস্থাপন করতে পারলে বিষয়টা অনেক উপভোগ্য হয়। আমি একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষক। অনেক সময় হাতের কাছে পাওয়া সামান্য উপকরণ ছেলেমেয়েদের অনেক আগ্রহী করে গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু ক্লাসটাকে প্রাণবন্ত করার জন্য একজন মাধ্যমিক শিক্ষকের প্রস্তুতি মূলক সময় প্রয়োজন কিন্তু একজন শিক্ষককে দিনে ৫-৭ টা ক্লাস নিতে হয়। এতে করে একজন শিক্ষক ক্লাসটাকে উপভোগ্য করে তুলতে পারেন না। তাছাড়া অনেকের আন্তরিকতারও অভাব রয়েছে। তবে আমি মনে করি এই পেশাটা শুধু জীবিকা নির্বাহর জন্য নয়, সমাজকে , দেশকে অনেক কিছু দেবার আছে আমাদের। এই পেশাকে ভাল বাসতে হবে সকলকে। আর এই ভালোবাসা আমাদের অর্জন করতে হবে নিজেদের কাজের মাধ্যমে।

Share your thinking

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s