সরকারী কর্মজীবি

মাঝে মাঝেই রাস্তার ধারের দোকানগুলোতে চা খেতে যাই। দোকানগুলোতে চা খাওয়ার সময়ে একটা ব্যাপার সবসময় বিনা মুল্যে উপভোগ করা যায় সেটা হলো, বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষের বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্নরুপী মন্তব্য। বেশিরভাগ কথায় কান দেই না কারণ আমি যে এলাকায় থাকি সেখানের মানুষ একটু আলাদা, তাদের চিন্তা ভাবনাও আলাদা। বেশিরভাগ মানুষই ব্যবসায়ী অথবা বেকার। কেউ কেউ নিজের ব্যবসা সম্পর্কে চুটিয়ে আলাপ করে আবার কেউ কেউ আলাপ করে রাজনীতি নিয়ে। এইখানের রাজনীতিটা একটু ভিন্ন ধরনের। এই রাজনীতিতে ঝগড়ার চেয়ে মারামারির ভাগটাই বেশি।

এমনি একদিন গিয়েছিলাম চা খেতে। দেখছি কাঁচাপাকা চুলের এক ভদ্রলোক বেজায় চিৎকার করছেন, বাকি লোকজনকে অনেক কিছু বুঝানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু সবাই তার দিকে একটু বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে। অন্যদিনের মত সেদিনও কথা এড়িয়ে চা পানের দিকে মনোনিবেশ করলাম। চা খেতে খেতে দেখছি লোকটার কথার দিকে বারবার মন চলে যাচ্ছে। নিজের অজান্তেই খুব মনযোগ দিয়ে কথা শোনা শুরু করলাম। তার কথার বিষয়বস্তু একটু বিরক্তিকর। কারণ তিনি নিজেই, অকপটে বলছেন, “তিনি ঘুষ খান”। তিনি একজন সরকারী কর্মজীবি। মাসে তার বেতন মাত্র আঠার হাজার টাকা। তিনি অনেক চেষ্টা করেছেন ঘুষ না খাওয়ার, কিন্তু তিনি পারেননাই। কারণটা সাথে সাথেই ব্যাখ্যা করছেন, বলছেন- “এই বেতন দিয়ে তার তিন ছেলেমেয়ের লেখাপড়া সহ সংসার চালানো অসম্ভব”। এমন কথা শুনে আমার একটু মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। তাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি প্রাইভেট চাকুরী কেন করেন না? তিনি আমাকে উত্তর দিলেন, আগে প্রাইভেট চাকুরী করতেন, বেতন মোটামুটি ভালই ছিল। একদিন তার সরকারী চাকুরীজীবি বন্ধুর সাথে চরম ঝগড়া করে উপলব্ধি করেছিলেন, দেশসেবা করতে হলে সরকারী চাকুরী করতে হবে এবং এখানে চাকুরী করে সিস্টেমকে বদলাতে হবে। পরে অনেক কষ্ট নিয়ে বললেন, “সিস্টেমকে বদলাতে গিয়ে নিজেই বদলে গিয়েছি”।

প্রাইভেট বাদ দিয়ে সরকারী চাকুরী শুরু করলাম। প্রথমে অনেক কাজ করতাম। কোন ভেজাল কাজ দেখলেই বাধা দিতাম। এক সময়ে দেখলাম অফিসের কেউ আমার সাথে ঠিক মত কথা বলছেনা। একদিন অফিসে আমার সিনিয়র ডেকে কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিলেন, বললেন, “যে ফাইলটা তোমার কাছে আটকে আছে সেটা সাইন করে ছেড়ে দাও”। আর এই টাকা তোমার চা খাওয়ার জন্য। আমার হাতে কিছুটা জোর করেই টাকাটা ধরিয়ে দিলেন, কিছু বলতে পারলাম না! সেই থেকেই আমার এই অন্যায় আয়ের সূত্রপাত। একবার ভেজাল রাস্তায় পা দিয়ে যেন আর কখনোই বের হতে পারছিনা। দেখলাম আমার পরিবারকে আমি যা দিতে পারতাম না, এখন তা দিতে পারি। ছোট্ট মেয়েটা যখন একটি জামা পছন্দ করে, তখন তাকে তা কিনে দিতে পারি। আমি জানি আমার এই আয় ঠিক না, তবে আমি এখন এই বেঠিক আয়কেই ঠিক বলে মনে করা শুরু করেছি।

ব্যাখ্যা করা শুরু করলেন, আমারই ছোটবেলার বন্ধু যখন আমার সামনে দিয়ে মার্সিডিজ চালিয়ে যায়, যার নেই কোনো উপযুক্ত শিক্ষা, শুধু আছে রাজনৈতিক বল, তখন মনে হয়না আমার এই ঘুষ বেশি খারাপ। এই রাজনীতিবিদদের ভোট দিয়ে আপনাদের মত মানুষরাই তাদেরকে দামি গাড়িতে চড়িয়েছেন। আমি যদি ঘুষ খেয়ে অপরাধ করে থাকি তাহলে আপনারা সবাই অপরাধী। আমি যা করেছি আমার সংসার চালানোর জন্য করেছি। আমি যাদের কাছে থেকে টাকা নিয়েছি তারা আমাকে যে টাকা দেয় তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশী টাকা দেয় আপনাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। তাই আমার ভুলকে এখন আর ভুল মনে হয়না, মনে হয়, যা করছি তা তো খারাপের ভাল।

তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি জানেন আমাদের দেশের কেন উন্নতি হচ্ছে না?” আমি চুপ করে থাকলাম। গড়গড় করে নিজেই উত্তর দেওয়া শুরু করলেন, “আমাদের জন্যই”। বলতে পারেন কেন সরকারী কর্মজীবিদের বেতন বাড়ছেনা? আবারো তিনি উত্তর দিলেন, আপনাকে বেশি টাকা দিলে আপনি ঠিকমতো চলতে পারবেন, কারো কাছে কোন কিছু চাইতে হবে না, কাজ করবেন ঠিকমত, কারো অন্যায় আবদার শোনার সময় আপনার থাকবেনা, নিয়োগে দলীয়করণ হবেনা। দলীয়করণ না হলে, যোগ্য মানুষ থাকবে সব জায়গায়, আর তারা তো ওনাদের কথা শুনবেন না। সরকার চলবে কেমন করে! তাই এদেশের মানুষ যতদিন পর্যন্ত নিজের ভাল না বোঝা শুরু করছে ততদিন পর্যন্ত দেশ উন্নত হবে না। আমাদের এমন ঘুষ খেয়েই চলতে হবে।

সরকারি ক্যাডারে ৫৫ ভাগ কোটা কেন জানেন? কারণ যোগ্য ব্যাক্তিদের সবসময় বঞ্চিত করা হবে। আজকে যদি ৫৫ ভাগ কোটা দৃশ্যত হয় তবে পরের সরকার এসে এটাকে বাড়িয়ে অদৃশ্যত ৬৫ ভাগ করবে। এইভাবে বাড়তেই থাকবে দিন দিন অদৃশ্যত কোটা। অযোগ্য মানুষ যোগ্যদের দেখে হাসবে। বলবে দেখো “রাজনীতি করেই আজ আমি তোমার কত্ত উপরে”।

অনেক চিৎকার করার পরে তিনি বললেন- এত খারাপ দেখি, খারাপ করি, সমালোচনা করি কিন্তু কখনো এই দেশের প্রতি বিন্দু মাত্র মায়া কমে নাই। মনে করি, নিজের সমালোচনা করছি। আশার আলো দেখতে পাই, মনে হয় যেন একদিন সবাই মন থেকে বুঝবে, উপলব্ধি করবে এবং গড়ে তুলবে সোনার বাংলাদেশ।

 

Advertisements

Share your thinking

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s