আত্নক্রন্দন

ক্যাডেট কলেজ থেকে যখন এস.এস.সি এর পরে দীর্ঘ তিন মাসের ছুটিতে এসেছিলাম তখন আমার গ্রামের বাড়ির বেশ কিছু মানুষের সাথে অনেক ভাল সম্পর্ক হয়ে যায়। খুব ভাল লাগত তাদের সাথে আড্ডা দিতে, মজা করতে। বিকেলে আমরা ব্রিজের উপর বসে চুটিয়ে আড্ডা দিতাম। বিকেলটা কেমন করে যে পার হয়ে যেত টেরই পেতাম না। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে আমাদের মাঝে এমন একজন ছিলেন, যার আমাদের সাথে আড্ডা দিয়ে মজা নেওয়ার মত কিছুই ছিল না। উনি ছিলেন আমাদের চেয়ে বয়সে কিছুটা বড়। নাম ছিল আরশেদ ভাই। উনার পৃথিবীটা ছিল আমাদের চেয়ে আলাদা। কারণ উনি না পারতেন কিছু বলতে, না পারতেন কিছু শুনতে। খুব অবাক করা ব্যাপার হল, উনি আমাদের সাথে থেকে অনেক আনন্দ পেতেন। আমরা যখন হাসতাম, জোকস বলতাম, উনিও আমাদের সাথে সাথে হাসতেন। উনার হাসি দেখে মনে হত আর যাই হোক এমন ভিন্ন পৃথিবীর মানুষকে একটু আনন্দ দিতে পেরেছি। আমাকে উনি কেন জানি বেশি পছন্দ করতেন। আমি সাইন ল্যাংগুয়েজ বুঝি না তাই উনার খুব কম কথাই বুঝতাম। শুধু উনাকে খুশি করার জন্য মুখে একটা হাসি নিয়ে থাকতাম এবং উনার হ্যাঁ এর সাথে হ্যাঁ মিলিয়ে যেতাম। যখন ছুটি শেষ হয়ে গেল, তখন সব বন্ধুদের সাথে দেখা করে বিদায় নিতে এলাম, উনার সাথেও দেখা হল। সবার মন খারাপ, চলে যাচ্ছি ওদের ছেড়ে ক্যাডেট কলেজে। দেখলাম উনিও আমাকে বিদায় দিলেন। আর সবার মত করে কিছু বলে বিদায় দিতে পারলেন না, শুধু দেখলাম উনার চোখ ভরা পানি। যাই হোক এই মানুষটির কথা প্রায়ই মনে পড়ে। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে যখন আমরা সবাই উনার মত হয়ে যাই, কথা বলার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যখন নিজেরা বোবার মত কিছু বলতে পারি না। কথা বলতে পারা সত্ত্বেও যখন কিছু বলার থাকে না।

এমন আত্নকান্না হয়ত আমরা প্রতিনিয়ত কাঁদছি, কারো হয়ত চোখে পড়ছেনা। কান্নার কথা বলতে গিয়ে সবকিছু থেমে যায়, কোথা থেকে শুরু করব আর কোথায় গিয়ে শেষ করব বুঝে উঠতে পারিনা। তবে কিছু জিনিস না শেয়ার করলে নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হচ্ছে!

একদিন সন্ধ্যায় বাসে বনানী যাচ্ছিলাম। মানিকমিয়া এভিনিউয়ে বাস যখন থামল তখন দেখলাম একজন মধ্যবয়সী মহিলা বুকে ব্যাগ চেপে ধরে এসে তাড়াতাড়ি করে বসলেন আমার পাশে। প্রথমে আমি উনার দিকে খুব একটা খেয়াল করিনাই। কিছুক্ষন পরে কান্নার শব্দ শুনছি বলে মনে হল। পাশে তাকিয়ে দেখলাম, মহিলাটি অনবরত কাঁদছেন। কারণ বুঝতে পারলাম না। পরে উনাকে জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে? কাঁদতে কাঁদতে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, যে এই কাজ করেছে তার সাথে আমি এক বাসে যাচ্ছি ভাবতেও ঘৃনা হচ্ছে। বাকিটুকু বুঝতে আর দেরি হলো না। কি বলে উনাকে সান্ত্বনা দেব বুঝে উঠতে পারলাম না। দেখলাম জায়গাটা একটু অন্ধকার। আর এই অন্ধকারে বাসে উঠতে গিয়ে মায়ের বয়সী মহিলা নিজেকে রক্ষা করতে পারেন নাই। বাসের সামনে পেছনে ভাল করে লক্ষ্য করলাম। কাউকে দেখে তো পশুর মত মনে হলো না। সবাইকেই দেখে মনে হলো ভদ্র শিষ্ঠ পরিবারের লোকজন। ঠিক বুঝে উঠলাম না কেন এমনটা হলো। মানুষরূপী দানবগুলোকে কিভাবে খুঁজে বের করব তার চিন্তা করছিলাম। কিছুই করতে পারিনাই আমি। চুপচাপ থাকতে হয়েছে আমাকে আরশেদ ভাইয়ের মত। শুধু পার্থক্য এতটুকু যে উনি হয়ত শুনতে পেতেন না, আর আমি, আমার পাশে বসে থাকা মহিলার কান্না শুনতে পেয়েছি। বুঝতে পেরেছি উনার ভেতরের হাহাকার!

এমনটি যেন প্রতিনিয়ত হচ্ছে আমাদের সমাজে। আমি জানিনা কি কারণে এমন হচ্ছে! আমি এ বিষয়ে দক্ষ না। আমি কোন সমাজ বিজ্ঞানী না। যদি বলেন মেয়েদের পর্দা না করার কারণে এমন ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে আমি বলব, “না”। প্রতিটি মহিলার সাথে মার্কেটে, ভীড়ে এমন ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে। কিছু সুযোগসন্ধানী পশু আমাদের পাশে প্রতিনিয়ত ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষের পরিচয় দিয়েই রয়েছে আমাদের সাথে কিন্তু আমরা তাদের চিনতে পারছিনা। এইসব পশুরা প্রতিনিয়তই শিকার করে যাচ্ছে। আর আমরা যখন মাঝে মাঝে এমনটি দেখতে পাই তখন বুঝতে পারি। মন্তব্য করি “আসলে খুব বাজে হচ্ছে”। শুধু এতটুকু পর্যন্তই, এরপরে আমরা আসলে কি করতে পারছি!

আমার কাছে মনে হয়েছে এমন পশুদের আসলে আমাদের সনাক্ত করা দরকার। সনাক্ত করে এদেরকে কঠোরভাবে বিচার করা উচিৎ। এই সমস্ত পশুদের আমরা যুগযুগ ধরে দেখে এসেছি। এখনো দেখছি। এরা সুযোগের সন্ধানে থাকে। সুযোগ পেলেই এরা প্রকাশ্যে হানা দিবে আমাদের উপর।

আমি আসলে ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করছি। একাত্তরে যে সব পশু দেখেছিল আমাদের দেশ, এরা হচ্ছে তাদেরই সম্প্রদায়। হয়ত ভিন্ন উদর থেকে বের হওয়া, কিন্তু চারিত্রিক  বৈশিষ্ট্য এক। এরা আমাদের সমাজে কিভাবে লুকিয়ে ছিল ভাবুন। এখন এদের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে অনেক বেশি। দিন দিন এরা হিংস্র হচ্ছে। ইতিহাসে এদের উদাহরন আরো আছে। কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া বি.ডি.আর বিদ্রোহ, আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম এদের হিংস্রতা। মানুষের কোন  বৈশিষ্ট্য তাদের মাঝে সেদিন ছিল কিনা আমার জানা নেই। চারদিকে শুধু হাহাকার করা ছাড়া আমাদের আর কোন কিছুই করার ছিল না। কথা বলার সামর্থ্য থাকা স্বত্বেও সেদিন হয়েছিলাম আমরা বোবা। আজ আমরা দিনে দিনে অনেকটায় ভুলে গিয়েছি তাদের কথা।

সেদিন আমার এক বন্ধু বলছিল, আমরা নাকি গোল্ড ফিস জাতি। আমরা নাকি কোন কিছু মনে রাখতে পারিনা। আমি তাকে উত্তর দিয়েছিলাম, আসলে আমরা মনে রাখতে পারিনা না এইটা ঠিক না, আমাদের মনে রাখতে দেওয়া হয় না। আমাদের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া এই সমস্ত গুরুতর ঘটনাকে সর্বসাধারনের আলোচ্য বিষয় থেকে সরে নেওয়া হয় কিছুটা জোর করেই। আমাদের সামনে নতুন করে উপস্থাপন করা হয় নতুন বিষয়বস্তু। সর্বসাধারন সেই নতুন বিষয় নিয়ে মত্ত থাকে আর যাদের পরিবার ভুক্তভোগী তারা সারাটি জীবন কাঁদে বোবার মত। এ আত্নকান্না তাদের কখনই থামে না।

আমি নিজেও যে এমন পশুদের রুপ দেখিনাই তা বলবনা। কাজের মেয়ে বাসা থেকে পালিয়ে গিয়েছিল, মাকে নিয়ে গিয়েছিলাম চকবাজার থানায়। সেখানে দেখেছি কিছু পশুর দৃষ্টি। আমার মা বোরখা পরিহিত ছিলেন। দেখছিলাম পশুগুলো কতটা হিংস্র। আমি সে দিনের কথা ভুলতে পারিনাই আজও। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয় দেওয়ার পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। পশুগুলোকে টাকাও দিয়ে আসতে হয় জেনারেল ডায়েরী করার জন্য। আমি একবারে সবাইকে দোষ দিতে চাই না, কারণ সব পুলিশ এমন না। তবে কোন এক বিশেষ কারণে এদের মাঝে এই স্বভাব প্রায়ই দেখা যায়। এদেরকে আমাদের থামাতে হবে। এরা দিন দিন হিংস্র হচ্ছে। এরা কোনকিছু করতে পিছু পা হয় না। রক্ষক যদি ভক্ষক হয় তাহলে আমাদের রক্ষা করবে কে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে শুরু করে, বড় বড় রাজনৈতিক নেতা পর্যন্ত কাউকে অকারণে পেটাতে এরা পিছু পা হয় না। রাস্তায় মোড়ে মোড়ে চাঁদাবাজি করে। এদের সামনে ছিনতাই হয় এরা দেখে না। টাকা চাইতে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব নাই এদের মাঝে। যতই ভিডিও ফুটেজ তুলে ধরা হোক না কেন এদের চামড়া এতটা মোটা যে এদেরকে কোনভাবেই থামানো যাচ্ছে না। তারা যে এমন এতে আমাদের দেশের কারও বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু কেন এদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ কেন গ্রহন করা হয় না সেটা নিতান্তই অবাক করা বিষয়। এভাবে যদি আমরা এদের প্রশ্রয় দেই তাহলে রক্ষকের ভক্ষন করার হার বেড়ে এমন হবে যে আমাদের টিকে থাকাটায় দায় হয়ে দাঁড়াবে।

সমাজে নিরাপত্তা কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী কিন্তু মধ্যবিত্ত,নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠী। বিশেষ করে আমি বলছি রাস্তায় চলাফেরার ক্ষেত্রে। বিত্তবানদের নিজেদের যানবাহন আছে। তাদের এইসব ব্যাপার নিয়ে খুব একটা চিন্তা করতে হয় না। রাস্তার পাশে ভিড়ের মাঝে খুব একটা হাঁটতে হয় না, অন্ধকারে বাসে উঠতে হয় না, তাদের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেওয়ার চান্সটাও খুব কম থাকে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ তো এই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা। এদের নিরাপত্তার জন্য অতি শীঘ্রই ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিৎ সরকারের। দরকার হলে আলাদা মহিলা বাস সার্ভিস চালু করা উচিৎ খুব তাড়াতাড়ি। রাস্তায় চলার সময়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের রক্ষকরা যেন আমাদের রক্ষা করে তার ব্যবস্থা করতে হবে। চাঁদাবাজিতে ব্যস্ত থাকলে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয় এইটাও চিন্তা করা উচিৎ আমাদের।

সবশেষে আমি বলতে চাই আমাদের সচেতন পরিবার থেকেই খুব সুন্দর সুন্দর ভদ্র চেহারার ছেলেরা, মানুষ থেকে এমন পশুতে রূপ নিচ্ছে প্রতিনিয়ত। বাবা মা শুধু পড়ালেখার দিকে খেয়াল করতে গিয়ে, ছেলেদের চরিত্রের দিকে খেয়াল করতে ভুলে যান, খেয়াল করেন না ছেলের সঙ্গী-সাথী কারা। কিছু ব্যাপার আছে, যা ছেলেমেয়েরা পরিবার থেকে শেখে। ছোটবেলা থেকে মেয়েদেরকে সম্মান করা যদি কোন ছেলে না শেখে, তাহলে তার মানসিকতা এমন বিকৃত হবে, খুব স্বাভাবিক। তাই আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত যে অপরাধগুলো হচ্ছে, যা আমরা দেখতে পেয়েও কিছু বলতে পারি না, খুঁজে পাই না কে করছে, তা আসলে ঘটছে যথাযথ পারিবারিক শিক্ষার অভাবে। পরিবার থেকে আমরা যদি সঠিকভাবে শিখিয়ে দেই, মেয়েদের যথাযথ সম্মান করতে হবে, তাহলে হয়ত এইসব সমস্যা অনেকাংশেই কমে যাবে। সেক্ষেত্রে প্রথমেই যেটির অভাব আমি উপলব্ধি করেছি সেটি হল, বাবা অবশ্যই যেন মাকে যথাযথ সম্মানটুকু করেন। যে পরিবারের বাবা মাকে সম্মান করেন না, সে পরিবারের ছেলেরা কখনো পাশের বাসার মেয়ে তো দূরের কথা, নিজের বোনকেই রেসপেক্ট করতে পারে না। পারিবারিক ঝগড়া, কলহ এমনকি দ্বিমত পোষণ ছেলেমেয়েদের সামনে করা উচিৎ না কখনো। কারণ আপনি যা করছেন তাই আপনার ছেলেমেয়ের কাছে মডেল। মা বাবা যদি প্রতিনিয়ত নিজেদের মাঝে ঝগড়া করেন তাহলে ছেলেমেয়েরা ভাববে, এইটায় হয়ত স্বাভাবিক ব্যবহার। ছেলে হয়ত মনে করবে এইভাবেই মেয়েদের সাথে কথা বলতে হয়, সমঝোতা করতে হয় না, দমন করতে হয়। এইসব দেখে দেখেই তাদের হয় মানসিক বিকৃতি, আর তারা দিন দিন জড়িয়ে পরে বাজে বাজে অপরাধে একসময় মনুষ্যত্ব হারিয়ে অপরাধী হয়ে যায়। ভালকে খারাপ আর খারাপকে তাদের ভাল লাগে।

আমাদের উচিৎ পারিবারিকভাবে এই সামাজিক শিক্ষাকে জোরদার করানো। আজকের বাবা-মা অনেক শিক্ষিত, তারা যদি ধৈর্য ও শিষ্ঠার সাথে তাদের ছেলেমেয়েদের এসব শিক্ষা দেন তাহলে হয়ত এইসব অপরাধ কমতে থাকবে দিন দিন। শুধু বড় ডিগ্রী অর্জন করলেই মানুষ হওয়া যায় না, মানুষ হওয়ার জন্য মানবিক গুনাবলীর দরকার হয়, এই যথার্থ শিক্ষাটুকু যদি আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের দিতে পারি তাহলেই আমাদের জাতি হবে প্রকৃত মানবজাতি।

Advertisements

Share your thinking

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s