দানব

বাসার বারান্দা থেকে খেলার মাঠটা খুব ভাল করে দেখা যাচ্ছে। সেদিন খেলার মাঠটার দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিলাম। মাঠে কাঁদার মাঝে ফুটবল খেলতে খুব ইচ্ছে করছিল। আকাশটাও মেঘলা ছিল। মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম যেন ঝুম বৃষ্টি হয়। কিছুক্ষনের মাঝেই সৃষ্টিকর্তা আমার মনের আশা পূরণ করলেন। আমি আমার শর্টস পড়ে মাঠের দিকে দৌড় দিলাম। জানতাম যে কেউ না কেউ ফুটবল নিয়ে আসবেই। দৌড়ে আসতেই দেখতে পেলাম আমার মতই আসছে পাপ্পু, সোহেল, আসাদ, রুবেল ভাই আরো অনেকে। নেমে পড়লাম মাঠে, কি যে মজা বৃষ্টির মাঝে ফুটবল খেলা! বলে বোঝাতে পারবনা। বিস্তারিত পড়ুন

আত্নক্রন্দন

ক্যাডেট কলেজ থেকে যখন এস.এস.সি এর পরে দীর্ঘ তিন মাসের ছুটিতে এসেছিলাম তখন আমার গ্রামের বাড়ির বেশ কিছু মানুষের সাথে অনেক ভাল সম্পর্ক হয়ে যায়। খুব ভাল লাগত তাদের সাথে আড্ডা দিতে, মজা করতে। বিকেলে আমরা ব্রিজের উপর বসে চুটিয়ে আড্ডা দিতাম। বিকেলটা কেমন করে যে পার হয়ে যেত টেরই পেতাম না। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে আমাদের মাঝে এমন একজন ছিলেন, যার আমাদের সাথে আড্ডা দিয়ে মজা নেওয়ার মত কিছুই ছিল না। উনি ছিলেন আমাদের চেয়ে বয়সে কিছুটা বড়। নাম ছিল আরশেদ ভাই। উনার পৃথিবীটা ছিল আমাদের চেয়ে আলাদা। কারণ উনি না পারতেন কিছু বলতে, না পারতেন কিছু শুনতে। খুব অবাক করা ব্যাপার হল, উনি আমাদের সাথে থেকে অনেক আনন্দ পেতেন। আমরা যখন হাসতাম, জোকস বলতাম, উনিও আমাদের সাথে সাথে হাসতেন। উনার হাসি দেখে মনে হত আর যাই হোক এমন ভিন্ন পৃথিবীর মানুষকে একটু আনন্দ দিতে পেরেছি। আমাকে উনি কেন জানি বেশি পছন্দ করতেন। আমি সাইন ল্যাংগুয়েজ বুঝি না তাই উনার খুব কম কথাই বুঝতাম। শুধু উনাকে খুশি করার জন্য মুখে একটা হাসি নিয়ে থাকতাম এবং উনার হ্যাঁ এর সাথে হ্যাঁ মিলিয়ে যেতাম। যখন ছুটি শেষ হয়ে গেল, তখন সব বন্ধুদের সাথে দেখা করে বিদায় নিতে এলাম, উনার সাথেও দেখা হল। সবার মন খারাপ, চলে যাচ্ছি ওদের ছেড়ে ক্যাডেট কলেজে। দেখলাম উনিও আমাকে বিদায় দিলেন। আর সবার মত করে কিছু বলে বিদায় দিতে পারলেন না, শুধু দেখলাম উনার চোখ ভরা পানি। যাই হোক এই মানুষটির কথা প্রায়ই মনে পড়ে। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে যখন আমরা সবাই উনার মত হয়ে যাই, কথা বলার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও যখন নিজেরা বোবার মত কিছু বলতে পারি না। কথা বলতে পারা সত্ত্বেও যখন কিছু বলার থাকে না। বিস্তারিত পড়ুন

সর্ষের মধ্যে ভূত

১.সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঘড়ি দেখলাম ৮টা ৪০মিনিট। ৯টা থেকে ক্লাস নিতে হবে, আর মাত্র ২০মিনিট বাকি। তাড়াহুড়া করে ফ্রেশ হয়ে রওনা দিলাম। রাস্তায় এসে দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বাস চলে গেছে। ঠিক তখনি দেখলাম একজন লোক দ্রুত একটি রিকশা চালিয়ে আসছে। দেখে ঠিক স্বাভাবিক মনে হল না, মনে মনে ভাবলাম এত জোরে কেমন করে আসছে! পরে সেই রিকশায় উঠে পড়লাম। দেখলাম এ এক নতুন প্রজন্মের রিকশা। এই রিকশা চালাতে প্যাডেল করতে হয় না। রিকশার নিচে মটর লাগানো। রিকশার হ্যান্ডেলের কাছে স্পিড বাড়ানো কমানোর অপশন আছে।সিটের নিচে ১২ ভোল্টের কয়েকটা ব্যাটারি আছে। সারারাত চার্জ হয় আর দিনে কয়েক ঘণ্টা চালানো যায়। ভাবলাম ভালই তো, মানুষকে কষ্ট করে আর প্যাডেল মারতে হবে না। চিন্তা করলাম টেকনোলজি এগিয়ে যাচ্ছে। রিকশায় ব্যাটারি এবং মটর লাগিয়ে মানুষ অটোরিক্সা বানিয়ে ফেলছে।

২. ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে,মফস্বলে এখন প্রতিনিয়ত কিছু যানবাহন দেখা যায়, যাদেরকে আমরা টম্‌টম্‌ বলি। যানগুলো ট্রাইসাইকেল টাইপের। চীন থেকে আমদানিকৃত। এই যানবাহনগুলো এখন আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে গেছে। এদের স্পিড লিমিট ২০-২৫ কিলোমিটার/ঘন্টা। পরিবেশবান্ধব এই যানবাহনগুলো দেখতে এবং এতে চড়ে ঘুরতে মজায় লাগে। এইসব যানে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর খরচটাও কিছুটা কম। আরো কিছু সুবিধা রয়েছে, সেটা হল এইসব চালাতে তেল ভরতে হয় না, তাই যারা চালায় তাদের কাছে এগুলো অনেক লাভজনক।

৩. আমার এক বন্ধু আমাকে বলছিল একদিন, একটা আই.পি.এস পছন্দ করে দিতে। বাজারে গিয়ে দেখলাম হরেক রকমের আই.পি.এস। একটি নামীদামী কোম্পানির আই.পি.এসের দাম সবচেয়ে বেশি। বাকি কোম্পানির আই.পি.এস এর দাম তুলনামুলক কম। কিছু ছিল লোকাল প্রোডাক্ট, ইনভার্টার এবং ব্যাটারি আলাদা। অনেক ঘুরাঘুরি করে আই.পি.এস না কিনেই চলে আসলাম।

উপরের ঘটনাগুলো বলার পেছনে আমার বিশেষ কিছু উদ্দেশ্য আছে, সেগুলো ব্যাখ্যা করছিঃ

নিজেদের এলাকায় যখন ইলেক্ট্রিসিটি চলে যায় তখন আমরা অনেক রেগে যাই। প্রথমেই সরকারকে গালি দেই। এরপরে গালি দেই বি.পি.ডি.বি, আর.ই.বি, ডেসা অথবা ডেসকোর লোকজনদের। কিন্তু আসলে সমস্যাটা কোথায় সেটা নিয়ে কখনও ভাবি না। শুধু চিন্তা করি দেশে হয়তো নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট নির্মান হইলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে!

আমি একটু আলাদা ভাবে ব্যাপারটাকে দেখি। ধরুন আপনার বাবার অনেক টাকা আছে কিন্তু আপনি সেই টাকার যথাযথ ব্যবহার করছেন না। শুধু হেসে খেলে গেয়ে উড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। তো এই টাকা আসলে কতদিন থাকবে আপনার কাছে? উত্তরটা খুবই সহজ, বেশিদিন না। কিছুদিনের মাঝেই আপনার দামি গাড়ি এবং বাড়িটা বিক্রি করে দিতে হবে, পথে বসতে হবে। তেমনি অবস্থা আমাদের পাওয়ার সেক্টরের। এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে কিন্তু খরচ কিভাবে করব তার কোন প্ল্যানিং নাই। আমি প্রথমে যেসব যানবাহনের কথা বলছি সেসব আমাদের দেশের জন্য একদমি উপযোগী নয়। কারণটা খুব সহজ, গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি সেখানে কর্মদক্ষতা ৪৫-৫৫%, বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সাপ্লাই দিতে লস করছি অবশেষে যে যানবাহন সারারাত ধরে ব্যাটারি চার্জ দিয়ে সকালে বের হয় তাদের কর্মদক্ষতা মাত্র ১৫-৩০%। আরো সহজ করে বললে ব্যাপারটা এমন হয়, আমি আপনাকে ১০০ টাকা ধার দিলাম কিছুদিন পরে এসে আপনি আমাকে লাভ তো দুরের কথা, ফেরত দিলেন মাত্র ১৫ টাকা। আমি যখন আপনাকে জিজ্ঞাসা করলাম বাকি টাকা কই গেল! আপনি আমাকে উত্তর দিলেন সিস্টেম লস=৮৫টাকা। আমাদের মত দেশে এমন চার্জার ট্রাইসাইকেল কিংবা চার্জার মটরচালিত রিক্সা চালানো যেন বিলাসিতা। আর এইসব লোডের হিসেব বি.পি.ডি.বি রাখতে পারবেই বা কি করে! বেশিরভাগ গাড়িকে চার্জ দেওয়া হয় চোরাই লাইনের মাধ্যমে।

এখন আসি আই.পি.এস এর কথায়। ঢাকা শহরে বেশিরভাগ বাসায় এখন আই.পি.এস আছে। এ যেন স্বার্থপরতার এক নতুন নমুনা। আমার কাছে এটাকে মনে হয়, বাসায় রান্না হচ্ছে, অনেক মানুষ, খাবার কম পড়তে পারে বলে নিজের খাবারটা আগেই সরিয়ে রাখা।

আমাদের মত দেশে আই.পি.এস ব্যবহার করাটা রীতিমত অন্যায় কারণ একই, কর্মদক্ষতা। চার্জ করছেন ব্যাটারি, লস করছেন এনার্জি। কারেন্ট চলে যাওয়ার পরে আই.পি.এস ছাড়ছেন বিশাল এনার্জি লস করছেন কারণ আই.পি.এস এর কর্মদক্ষতা মাত্র ৩০-৬০%। এক্ষেত্রে সমাধান একটাই, বাজার থেকে ছোট মাপের একটি জেনারেটর কিনে নেওয়া। এই জেনারেটর ব্যবহার করলে আপনি শুধু ইলেকট্রিক্যাল এনার্জি সেভ এবং লসই কমাবেন না, সাথে সাথে বাসার ফ্যান,লাইটের লাইফটাইমও ঠিক রাখবেন। বাজারে যে সব আই.পি.এস পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই সাইনওয়েভ না যার কারণে আপনার লাইট, ফ্যানের বারোটা বাজিয়ে দেবে দিন দিন, হয়ত আপনি কখনও বুঝতেই পারবেন না, “কেন এইসব নষ্ট হচ্ছে এত তাড়াতাড়ি”!

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই ৩টি পাওয়ার প্লান্ট আছে। একটি ৫০মেগাওয়াট(এনার্জি প্রিমা), একটি ১০মেগাওয়াট(বি.পি.ডি.বি) এবং সবেমাত্র নির্মিত পাওয়ার প্লান্ট ১৫৬মেগাওয়াট(বি.পি.ডি.বি)। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই ৫০মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্টের শব্দে আশেপাশের মানুষের কাজ ও ঘুমে প্রচন্ড ব্যঘাত হয় সবসময়। আমি অবাক হই এমন একটি পাওয়ার প্লান্ট এই লোকালয়ে কেমন করে নির্মান করার অনুমতি পেল! নতুন যারা এই এলাকায় আসে তারা কেউ  ঘুমাতে পারে না, কিছুদিন পর থেকে যেন একটু একটু করে বিষ খেয়ে, বিষ হজম করা শিখে। আওয়াজ ছাড়া এখন তাদের ঘুমই আসে না। মনে হয় যেন কিছু একটা নেই।

একটি কথা না বললেই নয়, আমি ১০ মেগাওয়াট(বি.পি.ডি.বি) পাওয়ার প্লান্টকে কখনই চলতে দেখিনাই কারণ গ্যাসের স্বল্পতা। অথচ পাশের ৫০মেগাওয়াট(এনার্জি প্রিমা) প্লান্ট সবসময় চলছে এবং এর আওয়াজের কারণে এলাকার মানুষ তাদের শ্রবনশক্তি দিন দিন হারিয়ে ফেলছেন, যে বিষয়ে হয়ত তারা এখনো অজ্ঞ।

কেন আমরা বেসরকারি পাওয়ার প্লান্টের অনুমতি দেব এর উত্তর আমার মাথায় কখনও আসেনাই ভবিষ্যতে আসবে বলে মনে হয় না! একটি বেসরকারি পাওয়ার প্লান্টের সাথে চুক্তিটা হয় এমন, “আমি তাকে চুক্তিকৃত সময়ে গ্যাস সাপ্লাই দেব অনেক কম দামে। গ্যাসের দাম বাড়াতে পারবনা নির্দিস্ট পরিমানের বেশি। যতদিন তাদের সাথে চুক্তি থাকবে ততদিন গ্যাস সাপ্লাই দিতেই হবে এবং আমাদের বিদ্যুৎ কিনতেই হবে যার দাম সরকারী ভাবে উৎপাদনকৃত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রায় ৮-১০গুন বেশি”। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় পি.ডি.বি এর অনেক পাওয়ার প্লাণ্টকে গ্যাসের অভাব দেখিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে। এদের কোনটা ১০মেগাওয়াট, কোনটা ২০ মেগাওয়াট থেকে শুরু করে টঙ্গীর ৮০ মেগাওয়াট যা কিনা বছরের অর্ধেকের বেশি সময় বন্ধ থাকে।

বিদ্যুতখাতে আমাদের দুরদর্শিতার অভাব আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে একটি অন্ধকার অধ্যায়ের মাঝে। যে অন্ধকার থেকে চাইলেও আমরা মুক্তি পাব না। আমরা যদি এখনি সচেতন না হই তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অবস্থা হবে আরো শোচনীয়।

কিছু ব্যাপারে আমাদের এখনি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। লোড ব্যবহারে মনিটর করতে হবে। এনার্জি এফিসিয়েন্ট না, এমন যানবাহন, দ্রব্যাদি আমদানি, ব্যবহার অথবা উৎপাদন নিষিদ্ধ করতে হবে। তেলের গাড়িকে সি.এন.জিতে কনভার্ট করা অচিরেই বন্ধ করতে হবে। পূরো দেশে প্রিপেইড এনার্জি মিটার লাগাতে হবে, যাতে করে ভুতের বিদ্যুৎ ব্যবহার করা কমে যায়। কেমন করে সীমিত বিদ্যুতের সঠিক ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষনার নতুন নতুন দ্বার উন্মোচন করতে হবে। রিনিউএবল এনার্জির দিকে মনযোগ দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরী।

পরিশেষে বলতে চাই, “আমাদের সুচিন্তিত ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপের উপরই নির্ভর করছে আগামী প্রজন্মের আলোকিত ভবিষ্যৎ”।