সর্ষের মধ্যে ভূত

১.সকালে ঘুম থেকে উঠেই ঘড়ি দেখলাম ৮টা ৪০মিনিট। ৯টা থেকে ক্লাস নিতে হবে, আর মাত্র ২০মিনিট বাকি। তাড়াহুড়া করে ফ্রেশ হয়ে রওনা দিলাম। রাস্তায় এসে দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বাস চলে গেছে। ঠিক তখনি দেখলাম একজন লোক দ্রুত একটি রিকশা চালিয়ে আসছে। দেখে ঠিক স্বাভাবিক মনে হল না, মনে মনে ভাবলাম এত জোরে কেমন করে আসছে! পরে সেই রিকশায় উঠে পড়লাম। দেখলাম এ এক নতুন প্রজন্মের রিকশা। এই রিকশা চালাতে প্যাডেল করতে হয় না। রিকশার নিচে মটর লাগানো। রিকশার হ্যান্ডেলের কাছে স্পিড বাড়ানো কমানোর অপশন আছে।সিটের নিচে ১২ ভোল্টের কয়েকটা ব্যাটারি আছে। সারারাত চার্জ হয় আর দিনে কয়েক ঘণ্টা চালানো যায়। ভাবলাম ভালই তো, মানুষকে কষ্ট করে আর প্যাডেল মারতে হবে না। চিন্তা করলাম টেকনোলজি এগিয়ে যাচ্ছে। রিকশায় ব্যাটারি এবং মটর লাগিয়ে মানুষ অটোরিক্সা বানিয়ে ফেলছে।

২. ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে,মফস্বলে এখন প্রতিনিয়ত কিছু যানবাহন দেখা যায়, যাদেরকে আমরা টম্‌টম্‌ বলি। যানগুলো ট্রাইসাইকেল টাইপের। চীন থেকে আমদানিকৃত। এই যানবাহনগুলো এখন আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে গেছে। এদের স্পিড লিমিট ২০-২৫ কিলোমিটার/ঘন্টা। পরিবেশবান্ধব এই যানবাহনগুলো দেখতে এবং এতে চড়ে ঘুরতে মজায় লাগে। এইসব যানে চড়ে ঘুরে বেড়ানোর খরচটাও কিছুটা কম। আরো কিছু সুবিধা রয়েছে, সেটা হল এইসব চালাতে তেল ভরতে হয় না, তাই যারা চালায় তাদের কাছে এগুলো অনেক লাভজনক।

৩. আমার এক বন্ধু আমাকে বলছিল একদিন, একটা আই.পি.এস পছন্দ করে দিতে। বাজারে গিয়ে দেখলাম হরেক রকমের আই.পি.এস। একটি নামীদামী কোম্পানির আই.পি.এসের দাম সবচেয়ে বেশি। বাকি কোম্পানির আই.পি.এস এর দাম তুলনামুলক কম। কিছু ছিল লোকাল প্রোডাক্ট, ইনভার্টার এবং ব্যাটারি আলাদা। অনেক ঘুরাঘুরি করে আই.পি.এস না কিনেই চলে আসলাম।

উপরের ঘটনাগুলো বলার পেছনে আমার বিশেষ কিছু উদ্দেশ্য আছে, সেগুলো ব্যাখ্যা করছিঃ

নিজেদের এলাকায় যখন ইলেক্ট্রিসিটি চলে যায় তখন আমরা অনেক রেগে যাই। প্রথমেই সরকারকে গালি দেই। এরপরে গালি দেই বি.পি.ডি.বি, আর.ই.বি, ডেসা অথবা ডেসকোর লোকজনদের। কিন্তু আসলে সমস্যাটা কোথায় সেটা নিয়ে কখনও ভাবি না। শুধু চিন্তা করি দেশে হয়তো নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট নির্মান হইলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে!

আমি একটু আলাদা ভাবে ব্যাপারটাকে দেখি। ধরুন আপনার বাবার অনেক টাকা আছে কিন্তু আপনি সেই টাকার যথাযথ ব্যবহার করছেন না। শুধু হেসে খেলে গেয়ে উড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। তো এই টাকা আসলে কতদিন থাকবে আপনার কাছে? উত্তরটা খুবই সহজ, বেশিদিন না। কিছুদিনের মাঝেই আপনার দামি গাড়ি এবং বাড়িটা বিক্রি করে দিতে হবে, পথে বসতে হবে। তেমনি অবস্থা আমাদের পাওয়ার সেক্টরের। এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে কিন্তু খরচ কিভাবে করব তার কোন প্ল্যানিং নাই। আমি প্রথমে যেসব যানবাহনের কথা বলছি সেসব আমাদের দেশের জন্য একদমি উপযোগী নয়। কারণটা খুব সহজ, গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি সেখানে কর্মদক্ষতা ৪৫-৫৫%, বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সাপ্লাই দিতে লস করছি অবশেষে যে যানবাহন সারারাত ধরে ব্যাটারি চার্জ দিয়ে সকালে বের হয় তাদের কর্মদক্ষতা মাত্র ১৫-৩০%। আরো সহজ করে বললে ব্যাপারটা এমন হয়, আমি আপনাকে ১০০ টাকা ধার দিলাম কিছুদিন পরে এসে আপনি আমাকে লাভ তো দুরের কথা, ফেরত দিলেন মাত্র ১৫ টাকা। আমি যখন আপনাকে জিজ্ঞাসা করলাম বাকি টাকা কই গেল! আপনি আমাকে উত্তর দিলেন সিস্টেম লস=৮৫টাকা। আমাদের মত দেশে এমন চার্জার ট্রাইসাইকেল কিংবা চার্জার মটরচালিত রিক্সা চালানো যেন বিলাসিতা। আর এইসব লোডের হিসেব বি.পি.ডি.বি রাখতে পারবেই বা কি করে! বেশিরভাগ গাড়িকে চার্জ দেওয়া হয় চোরাই লাইনের মাধ্যমে।

এখন আসি আই.পি.এস এর কথায়। ঢাকা শহরে বেশিরভাগ বাসায় এখন আই.পি.এস আছে। এ যেন স্বার্থপরতার এক নতুন নমুনা। আমার কাছে এটাকে মনে হয়, বাসায় রান্না হচ্ছে, অনেক মানুষ, খাবার কম পড়তে পারে বলে নিজের খাবারটা আগেই সরিয়ে রাখা।

আমাদের মত দেশে আই.পি.এস ব্যবহার করাটা রীতিমত অন্যায় কারণ একই, কর্মদক্ষতা। চার্জ করছেন ব্যাটারি, লস করছেন এনার্জি। কারেন্ট চলে যাওয়ার পরে আই.পি.এস ছাড়ছেন বিশাল এনার্জি লস করছেন কারণ আই.পি.এস এর কর্মদক্ষতা মাত্র ৩০-৬০%। এক্ষেত্রে সমাধান একটাই, বাজার থেকে ছোট মাপের একটি জেনারেটর কিনে নেওয়া। এই জেনারেটর ব্যবহার করলে আপনি শুধু ইলেকট্রিক্যাল এনার্জি সেভ এবং লসই কমাবেন না, সাথে সাথে বাসার ফ্যান,লাইটের লাইফটাইমও ঠিক রাখবেন। বাজারে যে সব আই.পি.এস পাওয়া যায় তার বেশিরভাগই সাইনওয়েভ না যার কারণে আপনার লাইট, ফ্যানের বারোটা বাজিয়ে দেবে দিন দিন, হয়ত আপনি কখনও বুঝতেই পারবেন না, “কেন এইসব নষ্ট হচ্ছে এত তাড়াতাড়ি”!

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই ৩টি পাওয়ার প্লান্ট আছে। একটি ৫০মেগাওয়াট(এনার্জি প্রিমা), একটি ১০মেগাওয়াট(বি.পি.ডি.বি) এবং সবেমাত্র নির্মিত পাওয়ার প্লান্ট ১৫৬মেগাওয়াট(বি.পি.ডি.বি)। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই ৫০মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্টের শব্দে আশেপাশের মানুষের কাজ ও ঘুমে প্রচন্ড ব্যঘাত হয় সবসময়। আমি অবাক হই এমন একটি পাওয়ার প্লান্ট এই লোকালয়ে কেমন করে নির্মান করার অনুমতি পেল! নতুন যারা এই এলাকায় আসে তারা কেউ  ঘুমাতে পারে না, কিছুদিন পর থেকে যেন একটু একটু করে বিষ খেয়ে, বিষ হজম করা শিখে। আওয়াজ ছাড়া এখন তাদের ঘুমই আসে না। মনে হয় যেন কিছু একটা নেই।

একটি কথা না বললেই নয়, আমি ১০ মেগাওয়াট(বি.পি.ডি.বি) পাওয়ার প্লান্টকে কখনই চলতে দেখিনাই কারণ গ্যাসের স্বল্পতা। অথচ পাশের ৫০মেগাওয়াট(এনার্জি প্রিমা) প্লান্ট সবসময় চলছে এবং এর আওয়াজের কারণে এলাকার মানুষ তাদের শ্রবনশক্তি দিন দিন হারিয়ে ফেলছেন, যে বিষয়ে হয়ত তারা এখনো অজ্ঞ।

কেন আমরা বেসরকারি পাওয়ার প্লান্টের অনুমতি দেব এর উত্তর আমার মাথায় কখনও আসেনাই ভবিষ্যতে আসবে বলে মনে হয় না! একটি বেসরকারি পাওয়ার প্লান্টের সাথে চুক্তিটা হয় এমন, “আমি তাকে চুক্তিকৃত সময়ে গ্যাস সাপ্লাই দেব অনেক কম দামে। গ্যাসের দাম বাড়াতে পারবনা নির্দিস্ট পরিমানের বেশি। যতদিন তাদের সাথে চুক্তি থাকবে ততদিন গ্যাস সাপ্লাই দিতেই হবে এবং আমাদের বিদ্যুৎ কিনতেই হবে যার দাম সরকারী ভাবে উৎপাদনকৃত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের প্রায় ৮-১০গুন বেশি”। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় পি.ডি.বি এর অনেক পাওয়ার প্লাণ্টকে গ্যাসের অভাব দেখিয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে। এদের কোনটা ১০মেগাওয়াট, কোনটা ২০ মেগাওয়াট থেকে শুরু করে টঙ্গীর ৮০ মেগাওয়াট যা কিনা বছরের অর্ধেকের বেশি সময় বন্ধ থাকে।

বিদ্যুতখাতে আমাদের দুরদর্শিতার অভাব আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে একটি অন্ধকার অধ্যায়ের মাঝে। যে অন্ধকার থেকে চাইলেও আমরা মুক্তি পাব না। আমরা যদি এখনি সচেতন না হই তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অবস্থা হবে আরো শোচনীয়।

কিছু ব্যাপারে আমাদের এখনি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। লোড ব্যবহারে মনিটর করতে হবে। এনার্জি এফিসিয়েন্ট না, এমন যানবাহন, দ্রব্যাদি আমদানি, ব্যবহার অথবা উৎপাদন নিষিদ্ধ করতে হবে। তেলের গাড়িকে সি.এন.জিতে কনভার্ট করা অচিরেই বন্ধ করতে হবে। পূরো দেশে প্রিপেইড এনার্জি মিটার লাগাতে হবে, যাতে করে ভুতের বিদ্যুৎ ব্যবহার করা কমে যায়। কেমন করে সীমিত বিদ্যুতের সঠিক ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষনার নতুন নতুন দ্বার উন্মোচন করতে হবে। রিনিউএবল এনার্জির দিকে মনযোগ দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরী।

পরিশেষে বলতে চাই, “আমাদের সুচিন্তিত ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপের উপরই নির্ভর করছে আগামী প্রজন্মের আলোকিত ভবিষ্যৎ”।

 

সরকারী কর্মজীবি

মাঝে মাঝেই রাস্তার ধারের দোকানগুলোতে চা খেতে যাই। দোকানগুলোতে চা খাওয়ার সময়ে একটা ব্যাপার সবসময় বিনা মুল্যে উপভোগ করা যায় সেটা হলো, বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষের বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্নরুপী মন্তব্য। বেশিরভাগ কথায় কান দেই না কারণ আমি যে এলাকায় থাকি সেখানের মানুষ একটু আলাদা, তাদের চিন্তা ভাবনাও আলাদা। বেশিরভাগ মানুষই ব্যবসায়ী অথবা বেকার। কেউ কেউ নিজের ব্যবসা সম্পর্কে চুটিয়ে আলাপ করে আবার কেউ কেউ আলাপ করে রাজনীতি নিয়ে। এইখানের রাজনীতিটা একটু ভিন্ন ধরনের। এই রাজনীতিতে ঝগড়ার চেয়ে মারামারির ভাগটাই বেশি।

এমনি একদিন গিয়েছিলাম চা খেতে। দেখছি কাঁচাপাকা চুলের এক ভদ্রলোক বেজায় চিৎকার করছেন, বাকি লোকজনকে অনেক কিছু বুঝানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু সবাই তার দিকে একটু বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে। অন্যদিনের মত সেদিনও কথা এড়িয়ে চা পানের দিকে মনোনিবেশ করলাম। চা খেতে খেতে দেখছি লোকটার কথার দিকে বারবার মন চলে যাচ্ছে। নিজের অজান্তেই খুব মনযোগ দিয়ে কথা শোনা শুরু করলাম। তার কথার বিষয়বস্তু একটু বিরক্তিকর। কারণ তিনি নিজেই, অকপটে বলছেন, “তিনি ঘুষ খান”। তিনি একজন সরকারী কর্মজীবি। মাসে তার বেতন মাত্র আঠার হাজার টাকা। তিনি অনেক চেষ্টা করেছেন ঘুষ না খাওয়ার, কিন্তু তিনি পারেননাই। কারণটা সাথে সাথেই ব্যাখ্যা করছেন, বলছেন- “এই বেতন দিয়ে তার তিন ছেলেমেয়ের লেখাপড়া সহ সংসার চালানো অসম্ভব”। এমন কথা শুনে আমার একটু মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। তাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি প্রাইভেট চাকুরী কেন করেন না? তিনি আমাকে উত্তর দিলেন, আগে প্রাইভেট চাকুরী করতেন, বেতন মোটামুটি ভালই ছিল। একদিন তার সরকারী চাকুরীজীবি বন্ধুর সাথে চরম ঝগড়া করে উপলব্ধি করেছিলেন, দেশসেবা করতে হলে সরকারী চাকুরী করতে হবে এবং এখানে চাকুরী করে সিস্টেমকে বদলাতে হবে। পরে অনেক কষ্ট নিয়ে বললেন, “সিস্টেমকে বদলাতে গিয়ে নিজেই বদলে গিয়েছি”।

প্রাইভেট বাদ দিয়ে সরকারী চাকুরী শুরু করলাম। প্রথমে অনেক কাজ করতাম। কোন ভেজাল কাজ দেখলেই বাধা দিতাম। এক সময়ে দেখলাম অফিসের কেউ আমার সাথে ঠিক মত কথা বলছেনা। একদিন অফিসে আমার সিনিয়র ডেকে কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিলেন, বললেন, “যে ফাইলটা তোমার কাছে আটকে আছে সেটা সাইন করে ছেড়ে দাও”। আর এই টাকা তোমার চা খাওয়ার জন্য। আমার হাতে কিছুটা জোর করেই টাকাটা ধরিয়ে দিলেন, কিছু বলতে পারলাম না! সেই থেকেই আমার এই অন্যায় আয়ের সূত্রপাত। একবার ভেজাল রাস্তায় পা দিয়ে যেন আর কখনোই বের হতে পারছিনা। দেখলাম আমার পরিবারকে আমি যা দিতে পারতাম না, এখন তা দিতে পারি। ছোট্ট মেয়েটা যখন একটি জামা পছন্দ করে, তখন তাকে তা কিনে দিতে পারি। আমি জানি আমার এই আয় ঠিক না, তবে আমি এখন এই বেঠিক আয়কেই ঠিক বলে মনে করা শুরু করেছি।

ব্যাখ্যা করা শুরু করলেন, আমারই ছোটবেলার বন্ধু যখন আমার সামনে দিয়ে মার্সিডিজ চালিয়ে যায়, যার নেই কোনো উপযুক্ত শিক্ষা, শুধু আছে রাজনৈতিক বল, তখন মনে হয়না আমার এই ঘুষ বেশি খারাপ। এই রাজনীতিবিদদের ভোট দিয়ে আপনাদের মত মানুষরাই তাদেরকে দামি গাড়িতে চড়িয়েছেন। আমি যদি ঘুষ খেয়ে অপরাধ করে থাকি তাহলে আপনারা সবাই অপরাধী। আমি যা করেছি আমার সংসার চালানোর জন্য করেছি। আমি যাদের কাছে থেকে টাকা নিয়েছি তারা আমাকে যে টাকা দেয় তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশী টাকা দেয় আপনাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। তাই আমার ভুলকে এখন আর ভুল মনে হয়না, মনে হয়, যা করছি তা তো খারাপের ভাল।

তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি জানেন আমাদের দেশের কেন উন্নতি হচ্ছে না?” আমি চুপ করে থাকলাম। গড়গড় করে নিজেই উত্তর দেওয়া শুরু করলেন, “আমাদের জন্যই”। বলতে পারেন কেন সরকারী কর্মজীবিদের বেতন বাড়ছেনা? আবারো তিনি উত্তর দিলেন, আপনাকে বেশি টাকা দিলে আপনি ঠিকমতো চলতে পারবেন, কারো কাছে কোন কিছু চাইতে হবে না, কাজ করবেন ঠিকমত, কারো অন্যায় আবদার শোনার সময় আপনার থাকবেনা, নিয়োগে দলীয়করণ হবেনা। দলীয়করণ না হলে, যোগ্য মানুষ থাকবে সব জায়গায়, আর তারা তো ওনাদের কথা শুনবেন না। সরকার চলবে কেমন করে! তাই এদেশের মানুষ যতদিন পর্যন্ত নিজের ভাল না বোঝা শুরু করছে ততদিন পর্যন্ত দেশ উন্নত হবে না। আমাদের এমন ঘুষ খেয়েই চলতে হবে।

সরকারি ক্যাডারে ৫৫ ভাগ কোটা কেন জানেন? কারণ যোগ্য ব্যাক্তিদের সবসময় বঞ্চিত করা হবে। আজকে যদি ৫৫ ভাগ কোটা দৃশ্যত হয় তবে পরের সরকার এসে এটাকে বাড়িয়ে অদৃশ্যত ৬৫ ভাগ করবে। এইভাবে বাড়তেই থাকবে দিন দিন অদৃশ্যত কোটা। অযোগ্য মানুষ যোগ্যদের দেখে হাসবে। বলবে দেখো “রাজনীতি করেই আজ আমি তোমার কত্ত উপরে”।

অনেক চিৎকার করার পরে তিনি বললেন- এত খারাপ দেখি, খারাপ করি, সমালোচনা করি কিন্তু কখনো এই দেশের প্রতি বিন্দু মাত্র মায়া কমে নাই। মনে করি, নিজের সমালোচনা করছি। আশার আলো দেখতে পাই, মনে হয় যেন একদিন সবাই মন থেকে বুঝবে, উপলব্ধি করবে এবং গড়ে তুলবে সোনার বাংলাদেশ।

 

লুপের ভেতর শিক্ষা ব্যবস্থা

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা  একটা ছোট কিন্তু শক্ত লুপের ভিতর আটকে আছে। প্রথম লাইনটি পড়ার পর নিশ্চয় ভাবছেন আমি পাগলামি করছি। কিন্তু না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সত্যিই একটা লুপের ভেতর পরে গেছে।

একটু ভালো ভাবে চিন্তা করুন, বর্তমানে কি শিক্ষা টাকা ছাড়া সম্ভব? অনেকেই বলবেন শিক্ষার সঙ্গে টাকার কি সম্পর্ক ?  আছে, অবশ্যই আছে। হয়তোবা মধ্যমিক পর্যন্ত তেমন একটা নাই। কিন্তু উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ঠিকই আছে। চিন্তা করুন , কাউকে কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হলে আক্ষরিক অর্থে বস্তার বস্তা টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এটা এক প্রকার ব্যবসা হয়ে যায় যা টাকার ছাড়া চলে না। অনেকেই বলবেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আর এত টাকা লাগে না। কিন্তু ঐখানেও আছে এক সমস্যা। সবার কাছে আমার প্রশ্ন ভাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কতজন কোচিং না করে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে? হাতে গোনা কয়েকজন হয়তো পাওয়া যাবে এরকম। আর কোচিং সেন্টারে ভর্তি হওয়া মানে টাকার আরেক খেলা।
এখন বলুন টাকার গরম ছাড়া কয়জন আর উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারছে? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলেও টাকা লাগবে আর প্রাইভেটে ভর্তি হলে তো আর বলা লাগে না।

আমি শুধু আমাদের সমাজের একটা সমস্যার কথা তুলে ধরার চেষ্টা  করেছি মাত্র। আমি এর কোন সমাধান চিন্তা করি নাই। আমরা সবাই একসাথে চিন্তা করলে অবশ্যই এর সমাধান বের করতে পারব। আসুন আমরা সবাই আজেবাজে বিষয় বাদ দিয়ে একসাথে মিলে আমাদের সমাজের এই সমস্যা গুলো  নিয়ে চিন্তা করি।

 

 

এই পোস্টটি আজ থেকে ৫ মাস আগে আমার ব্লগে প্রকাশ করেছিলাম।

দেশপ্রেম

ধানমন্ডিতে গিয়েছিলাম কিছু কাজে। বাসায় ফিরব বলে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে আছি, রিকশা পাচ্ছিলাম না। যে রিকশাই দেখি, রিকশাওয়ালা ভাড়া প্রায়  দ্বিগুণ চেয়ে বসে। মেজাজটা এমনিতেই খারাপ কারণ সহ্যের সীমা অতিক্রম করে ফেলছিলাম। হঠাৎ একজন হ্যাঙলা পাতলা মতন ছেলে আমার সামনে রিকশা নিয়ে এসে বলল, “স্যার কোথায় যাবেন?” আমি একটু অবাক হলাম, কারণ রিকশাওয়ালারা সচরাচর স্যার বলে না, “মামা বলে”। আমি তাকে বললাম বকশিবাজার যাব, বোর্ড অফিসের পাশে। সে আমার কাছে ঠিক ঠিক ভাড়া চাইল। আমি মোটামুটি আকাশ থেকে পড়লাম, মনে করলাম এতক্ষণ পরে মনে হয় আধ্যাত্নিক সাহায্য এসে হাজির হয়েছে। যাইহোক বেশি চিন্তা না করে তাড়াতাড়ি রিকশাই উঠে পড়লাম। মনে মনে বললাম “আহ্‌! এখন একটু শান্তিমত মানুষ দেখতে দেখতে বাসায় যাওয়া যাবে”। ঢাকা কলেজের সামনের রাস্তা দিয়ে রিকশায় যাওয়াকে অনেক এনজয় করি। তবে সেদিনের রিকশা ভ্রমনটা একটু আলাদা ছিল। খেয়াল করছিলাম রিকশাওয়ালা অনেক সাবধানে চালিয়ে যাচ্ছিল। কাউকে গালি দিচ্ছিল না। অন্যের রিকশার সাথে লাগিয়ে দেওয়ার আগেই ব্রেক করছিল। কেউ তাকে গালি দিলে সে কিছু না বলে মাথা নিচু করে নিজের রিকশা চালানোতে ব্যস্ত ছিল। কিছুক্ষন পরে একটু অবাক হলাম, রিকশা যখন ঠিক ঢাকা কলেজের সামনে আসল, তখন রিকশাওয়ালা মুখে কাঁধের গামছাটা ভাল করে পেচিয়ে নিল। তার চেহারা ঠিকমত দেখা যাচ্ছিল না। ভেতরে ভেতরে একটু ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম, ভাবছিলাম এইবুঝি ছিনতাইকারী ধরবে। নিজেকে সামলিয়ে নিতে রিকশাওয়ালার সাথে কথা বলা শুরু করে দিলাম। সেই একই রকমের প্রশ্ন দিয়ে শুরু করলাম, “মামা বাড়ি কোথায়?” সে একিরকম উত্তর দিল, রংপুর। পরের প্রশ্ন করার আগেই বলল “স্যার বেশিদিন হয়নাই রিকশা চালাই”। স্বভাবতই জিজ্ঞাসা করলাম ঢাকা আসছ কবে? সে উত্তর দিল, “দুই বছরের কিছু বেশি হয়ছে”। এভাবেই অনেক কথা হল। একসময় হঠাৎ চালাতে গিয়ে আমার পায়ে টাচ্‌ লাগায় সে বলল, “সরি স্যার”। একটু অবাক হলাম তার ম্যানার দেখে। তাকে প্রশ্ন করতে দেরি করলাম না, “বললাম তুমি কি পড়ালেখা কর?” সে বলল, “স্যার অনার্স সেকেন্ড ইয়ার, ঢাকা কলেজে”। হতভম্ব হয়ে গেলাম। তার পোশাক আশাক চলন গড়ন আবার নতুন করে দেখা শুরু করলাম। দেখলাম পড়নে একটা প্যান্ট অনেক ময়লা, শার্টের কিছু জায়গায় ছেঁড়া। স্বাস্থ্য এতই কম যে মনে হয়, অনেক দিন না খেয়ে আছে। কৌতুহলবশত প্রশ্ন করলাম তুমি রিকশা চালাও কেন? সে বলল, তারা তিন বোন, এক ভাই। তার বাবা কিছুদিন আগে মারা গিয়েছে, মা ছোট থেকেই নেই। আগে বাবা দেশে দিনমজুর ছিল। এখন বাবা মারা যাওয়ার পরে তার তিন বোনকে সে ঢাকায় নিয়ে এসেছে, স্কুলে ভর্তি করিয়েছে, থাকে কামরাঙ্গির চরে, একটি রুম ভাড়া নিয়ে। কিছুদিন আগে তার দুইটি টিউশনি ছিল এখন একটিও নেই। সংসার চালানোর জন্য টাকা নেই যথেষ্ট, তাই উপায় না পেয়ে রাতের বেলা রিকশা চালাতে বের হয়েছে। মাঝে মাঝেই বের হয় এমন। তবে অনেক ভয়ে থাকে, যখন সে ঢাকা কলেজের পাশে দিয়ে যায়। পরিচিত কেউ দেখে ফেললে ক্লাস করাটা মুশকিল হয়ে যাবে। নিজে থেকেই বলল, “আমাকে হয়তো বলবেন অন্য কিছু করোনা কেন?” তারপর নিজে থেকেই উত্তর দেওয়া শুরু করল, পোলাপাইন অনেকে দেখি রাজনীতি করে, অনেক টাকা পায়, আবার অনেকে প্রতিদিন একটা করে মোবাইলের মালিকও হয়। কিন্তু আমার এমন কিছু করতে মন চায় না। সবসময় মনে করি একটা কথা, এই দেশকে কিছু না দিতে পারি কিন্তু এই দেশের কাছে থেকে জোর করে কিছু কেড়ে নিব না। আমার কাছে দেশ মানে আপনারা সবাই। আপনাদের সাথে কোন বেয়াদবি করা মানে দেশের সাথে নিমকহারামি করা। এই যে দেখেন আপনারা আছেন বলেই তো আমি এখন রিকশা চালায়ে কিছু টাকা আয় করতে পারছি। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে তার কথা শুনছিলাম। হঠাৎ সে আমাকে বলল স্যার চলে আসছি। আমি তাকে কিছু বেশি টাকা জোর করেই হাতে ধরিয়ে দিলাম। মনটা অনেক খারাপ হয়ে গেল। বাসায় এসে কোন কথা না বলেই শুয়ে পড়লাম বিছানায়।

মনে মনে ভাবছিলাম দেশপ্রেমটা আসলে কি? আমরা যখন অনেক বড় বড় কথা বলি, অনেক অনেক বড় বড় লোকের উদাহরণ দেই, বলি যে, “কি বিশাল দেশপ্রেমের উদাহরণ”। কিন্তু আজকে যা দেখলাম, তা থেকে আমার মাথায় প্রোগ্রাম করা দেশপ্রেমের সংজ্ঞাটা বদলে গেল এবং কিছুটা অবাকই হলাম এইটা ভেবে, পাঠ্যবইয়ে কোথাও দেশসেবার কোন বিশদ উদাহরণ দেখিনাই বাস্তব ক্ষেত্রে। যা পড়েছি সবই তো এখন ইতিহাস। এখন অনেক বড়, দেশের সেবা করতে গেলে আসলে আমাদের কি করা উচিৎ? ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভাবার পরে ছোট মস্তিস্ক থেকে কিছু ছোট ছোট উত্তর মিলেছে ঃ

আমার কাছে মনে হয়েছে দেশপ্রেম মানে দেশের মানুষকে ভালবাসা, আর দেশের সেবা মানে দেশের মানুষের সেবা করা।

অনেকের কাছে দেশের সেবা করা মানে হল শুধু গ্রামে গিয়ে গরিব শ্রেনীর মানুষকে সাহায্য করা, স্কুল তৈরি করে দেওয়া, রাস্তার পাশে খেতে না পারা ছেলেমেয়েকে খাওয়ানো, পড়ানো, শীতবস্ত্র বিতরণ ইত্যাদি। এইসব অবশ্যই ভাল কাজ, দেশের সেবা, কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, এইরকমের কাজ আমরা প্রতিনিয়ত করতে পারিনা। তারমানে কি আমরা প্রতিনিয়ত দেশের সেবা করতে পারব না? আরেকটু চিন্তা করে উপলব্ধি করা যায় যে, আমরা প্রতিনিয়ত যা করছি আমাদের কর্মজীবনে, সেটাকে ঠিকমত করাটাই হল দেশপ্রেম।

আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের দেশকে স্বাধীন করে আমাদের কাছে আমানত হিসেবে রেখে গিয়েছেন, এই আমানতকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখাটায় হচ্ছে দেশপ্রেম, দেশের সেবা । এই সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বিভিন্নজনের দায়িত্ব বিভিন্নরকম। কেউ ডাক্তার, কেউ প্রকৌশলী, কেউ শিক্ষক, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ ঠিকাদার, কেউবা ঝাড়ুদার। কারও অবদান কোন দিক থেকে কোন অংশে কম না। তাই নিজের দায়িত্বকে কোন অংশে বড় করে না দেখে চিন্তা করা উচিৎ আমরা সবাই দেশের সেবা করছি, দেশ আমাদের সবার। মাকে যেমন তার ছেলেমেয়ে সবাই সমান ভালবাসতে পারে, তেমনি দেশ, যার ছেলে মেয়ে আমরা সবাই, আমরা চাইলেই সবাই নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করে, নিজেদের কাজ ছেড়ে না দিয়ে, বরং নিজেদের কাজ যথাযথভাবে করেই দেশের সেবা করতে পারি।